রাধা অনু
রেসকোর্স থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। এ উদ্যানের একাধিক ইতিহাস রয়েছে। ১৮২৫ সালে ড’স জেলের কয়েদিদের নিয়ে রমনার জঙ্গল পরিষ্কার করে বের করে এনেছিল ডিম্বাকৃতির একটি অংশ, যার ফলে শহরের উত্তরাঞ্চল পরিচ্ছন্ন হয়ে উন্মুক্ত হয়েছিল বায়ু চলাচলের পথ। পরিষ্কার করা অংশটিকে কাঠের রেলিং দিয়ে ঘিরে তৈরি করেছিল রেসকোর্স। ইংরেজদের আমলে এই রেসকোর্সের উত্তর-পশ্চিমে একটি টিলা তৈরি করে তার চারদিকে লাগিয়েছিলেন ফার গাছ এবং টিলার ওপর তৈরি করেছিলেন গথিক রীতির ছোট একটি ঘর। লর্ড ড’সের তৈরি টিলাটি এখনো আছে, গথিক রীতির বাড়ির ধ্বংসাবশেষ কয়েকদিন আগেও ছিল।
তখনকার ঢাকার শিক্ষিত লোকজন বাড়িটির নাম দিয়েছিলেন ড’সের ফুল। এক সময় রমনা আগের অবস্থা ফিরে পেয়েছিল। প্রতিদিন সকালে সাহেবরা এই এলাকায় বেড়াতে আসতেন, এমনকি প্রাতঃভ্রমণ শেষে ইউরোপীয়রা মিলিত হতেন ড’সের টিলায় কফি খেতে। আসলে মূল শহরের সঙ্গে রেসকোর্সকে যুক্ত করার জন্য ড’স রেসকোর্সের উত্তর-পূর্ব দিকে তৈরি করেছিলেন একটি রাস্তা, যেটা এখন নজরুল এভিনিউ নামে পরিচিত। রাস্তার দু’পাশে লাগিয়েছিলেন মিমোসা বা ক্যাসুরিনা নামক দুষ্প্রাপ্য গাছ। এ ছাড়া অনেক গাছ আনা হয়েছিল নেপাল থেকে। এ রাস্তার জনশ্রুতি আছে, এ দুটি স্তম্ভ তৈরি করেছিলেন মীর জুমলা এবং তার নামানুসারে মীর জুমলা ফটকও বলা হয়। সেখানে রমনার কালীবাড়ি মন্দির ছিল। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী এ মন্দিরটিকে ভেঙে ফেলেছিল। এই ময়দানে এক সময় ঘোড়দৌড়ের রেওয়াজ ছিল। ১৮৩৬ সালে বিখ্যাত সিভিলিয়ান হেনরি বেভারিজ তার ভাইকে লিখেছিলেন, ঢাকার ঘোড়দৌড়ের তুলনা নেই এবং যেভাবে নেটিভরা তা দেখার জন্য ভিড় জমায়, তা দেখার মতো।

বিখ্যাত এই রেস প্রবর্তনে নবাবদের সাহায্য করেছিলেন ইংরেজ ম্যানেজার সিএল গার্থ। তাইফুর জানিয়েছিলেন, ১৮৭৭ সালের পহেলা জানুয়ারির পর থেকে প্রতি বছর শাহবাগে পালিত হতো নববর্ষ, যা হাকিম হাবিবুরের লেখা থেকে পাওয়া যায়। ধরে নেয়া যায়, এই ঘোড়দৌড়ের জন্য রেসকোর্স ময়দান মুক্ত রাখা হয়েছিল। প্রচলিত আছে, এই রেসকোর্সের উত্তরাংশে ইউরোপিয়ানরা মাঝে মধ্যে পোলো খেলতেন। এ রেসকোর্স ময়দান থেকে স্বাধীনতার বীজ বপন হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ থেকে সোহরাওয়ার্দী হয়ে ওঠে বাঙালির তীর্থক্ষেত্র। সেই রেসকোর্স ময়দান আজ তার জৌলসু হারিয়ে ফেলেছে। চারদিকে দুর্গন্ধ আর ময়লা-আবর্জনার স্তূপে ঢাকা। এখানে এখন বিভিন্ন মানুষের আনাগোনা। এভাবে চলতে থাকলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহ্য থাকবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here