ওয়ালী উলল্গাহ
১৮ বছর বয়স যে দুর্বার, পথে-প্রান্তরে ছুটায় বহু তুফান… বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী, বিপদের মুখে তবু নতুন কিছু তো করে… কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের এ শ্লোক যে আসলেই সত্য, তা প্রমাণ করে দিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব। অজানা অজানাই থাকবে, অনাবিষ্কৃতি অন্ধকারের মধ্যেই থাকবে_ তা হতে পারে না। অজানাকে জানা ও অনাবিষ্কৃতকে আবিষ্কার করাসহ নৈতিক ও মানসিক উৎকর্ষ লাভের মাধ্যমে বহুমুখী চৌহদ্দির অনুসন্ধানের জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল স্বপ্নবাজ তরুণ ভাবতে থাকে একটি সংগঠনের কথা, যার কাজ হবে দুঃসাহসিক অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার গণ্ডির বাইরে আরেকটি জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। যে-ই কথা সে-ই কাজ। ২০০৫-এর ১ জানুয়ারি প্রাথমিক আলোচনা শেষে ১ জুলাই আত্মপ্রকাশ। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ৩২তম ব্যাচের ছাত্র মুর্শেদ রায়হান হিমুকে সভাপতি করে তৈরি হয় প্রতিষ্ঠাতা কমিটি।
কমিটি এ সংগঠনকে মডেল হিসেবে তৈরি করার ব্রত নিয়ে কাজ শুরু করে। রোমাঞ্চ ও দুর্গম পথের বিপত্তিই ক্লাবের পাথেয় এবং তারুণ্য এর শক্তি। ‘আসুক বাধা, আসুক ভয়, আমরা করব বিশ্ব জয়’_ স্লোগানটি ধারণ করে ক্লাবটি এই তিন বছরে এগিয়ে গেছে অনেক দূর। সদস্য সংখ্যাও ১০০-এর বেশি। অভিযানের তালিকায় যোগ হয়েছে অনেক দুঃসাহসিক জায়গার নাম। এর মধ্যে ক্লাবটি ১৩টি অভিযান সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেছে। প্রতিষ্ঠার পর প্রথম অভিযানটি শুরু করে ২০০৫ সালের ১৬ জুলাই সাইকেলে বিশ্ব ভ্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে ময়মনসিংহের গারো পাহাড় ভ্রমণের মাধ্যমে। এর কিছুদিন পর তারা ক্যাম্পাসে মাছ ধরা কর্মসূচিতে অংশ নেয়। ২০০৬-এর ১৯ জুন ক্লাবের তিন সদস্য কোনো টাকা-পয়সা না নিয়েই মানুষের আন্তরিকতা ও সহযোগিতা নিয়ে ঢাকা থেকে সিলেট যায় এবং সিলেট ও হবিগঞ্জ জেলা ভ্রমণ করে। ‘সারাদিন অন্তত একটি ভালো কাজ করব’_ স্লোগানকে ধারণ করে এ ক্লাব প্রমাণ করে দিয়েছে, মানুষের পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়। ২০০৭ সালের বর্ষা মৌসুমে ক্যাম্পাসে প্রায় ২০০ ফুল, ফল ও ঔষধি গাছ রোপণ করেন ক্লাবের সদস্যরা। এর কয়েক দিন পর ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্য সামনে রেখে ক্লাবের পাঁচ সদস্য হেঁটে মানিকগঞ্জের জমিদার বাড়ি যান। এছাড়া প্রলয়ঙ্করী সিডরে আক্রান্তদের জন্য ক্লাবের সদস্যরা খাবার ও পোশাক সংগ্রহ করে উপাচার্যের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার দফতরে পাঠান। ২০০৮ সালের ৩০ এপ্রিল ক্লাবের সদস্যরা ঢাকা-সিলেট-ঢাকা ট্রেন মার্চ করেন।
দীর্ঘ তিন বছর পথচলার পর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নতুন সভাপতি হিসেবে নৃবিজ্ঞান বিভাগের ৩৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আলী ফিরোজের কাছে দায়িত্ব বুঝে দেন। তিনি দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে ক্লাবকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে থাকেন। গত বছরের ২২ আগস্ট কক্সবাজার ও সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য হিসেবে ভোটদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে ক্যাম্পাস থেকে সাইকেল চালনা করে গাজীপুর চৌরাস্তা হয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গারো পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত পেঁৗছে। এ অ্যাডভেঞ্চারে ব্যস্ত মহাসড়কে বাড়তি নিরাপত্তা ও মানুষের আকর্ষণ তৈরির জন্য সাইকেলে লাগানো হয় লাল নিশানা। ক্লাবের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সাইকেলে পুরো বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছয়টি দেশ ভ্রমণ, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গসহ এভারেস্ট জয় করা। ক্লাবের বর্তমান সভাপতি মোহাম্মদ আলী ফিরোজ জানান, আমরা আরও এগিয়ে যেতে চাই অনেক দূরে। যেখানে রয়েছে বীরের মর্যাদায় আসীন হওয়ার সুযোগ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here