সুমন্ত রায়
অনেকেরই হয়তো জানা নেই পৃথিবীর প্রথম মাইক্রোওয়েভসহ ক্রেস্কোগ্রাফ, রেজোন্যান্ট রেকর্ডার, মাইক্রোওয়েভ, বেতার প্রেরক যন্ত্র, বেতার গ্রাহক যন্ত্র, অণুতরঙ্গ গ্রাহক যন্ত্র, হর্ন এরিয়াল, ফটোসিনথেটিক বাবলার, গ্যালেনা ডিটেক্টর, সলিড টেস্ট ডায়োড ইত্যাদির আবিষ্কারক বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর জন্ম মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুরের রাঢ়ীখাল গ্রামে।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ট্রাইপস’ অর্থাত্ একই সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নশাস্ত্র এবং উদ্ভিদবিজ্ঞানে অনার্স পাস করা এই বিজ্ঞানী বিজ্ঞানসাধনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর জস্মস্থান তার পৈতৃক বাড়িটি এখন স্কুল ও কলেজ হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের নামে আছে প্রায় ২৫ একর সম্পত্তি। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার এবং শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ৩৩। ড. এমএ নাসের (সাবেক উপাচার্য বুয়েট), মাহে আলম (সাবেক সংস্থাপন সচিব), ড. হুমায়ুন আজাদ (প্রথাবিরোধী লেখক), ড. রামেশ্বর মণ্ডল (অধ্যাপক, ঢাবি), আ আ ম মাহমুদুল হক (সাবেক জিএম) প্রমুখ প্রতিষ্ঠানের কৃতী ছাত্র ছিলেন। নানা কারণে বিখ্যাত এই অঞ্চলকে ঘিরে বিক্রমপুরের স্থাপত্যশিল্প, পুরাকীর্তি, মনীষীদের জন্মভূমি, দর্শনীয় স্থানসমূহ এবং পদ্মা নদীকে ঘিরে একটি চমত্কার সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলার চিন্তাভাবনা চলছে।

উদ্দেশ্য, পর্যটকদের দর্শনীয় স্থানসমূহ ঘুরে দেখতে সহায়তা করা। এই পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক বলয়টি এমন হতে পারে -ঢাকা থেকে শ্রীনগর উপজেলা সংলগ্ন উপমহাদেশের সবচেয়ে উঁচু পুরাকীর্তিসমৃদ্ধ শ্যামসিদ্ধির মঠ। এরপর আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর বাড়ি হয়ে ড. হুমায়ুন আজাদের জ্যোতির্ময় আঙিনা (যেখানে তিনি চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে আছেন) ঘুরে ভাগ্যকুলের ঐতিহাসিক জমিদার যদুনাথ রায়ের বাড়ি। অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের অধীনস্থ এখানে নির্মিত হচ্ছে বিক্রমপুর জাদুঘর, পর্যটন কেন্দ্র, পিকনিক কর্নার, নৌ-মিউজিয়াম ইত্যাদি।

ভাগ্যকুলের সুস্বাদু মিষ্টির একটু স্বাদ নিয়ে সোজা মাওয়া পদ্মার তীরে। এখানে অনেকটাই সমুদ্র সৈকতের আবহ খুঁজে পাওয়া যায়। এখান থেকে পদ্মা রিসোর্ট হয়ে আরেক পৃথিবী বিখ্যাত ধর্মযাজক অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জন্মভূমি টঙ্গীবাড়ি উপজেলার বজনিবিড় ছায়ায় তার স্মৃতিচিহ্ন কিছুটা সময় হলেও সবাইকে মুগ্ধ করবে। এরপর বাবা আদম (স.)-এর মসজিদ ঘুরে সোজা মুন্সীগঞ্জ সদরে ঐতিহাসিক ইদ্রাকপুর কেল্লা, মুন্সীগঞ্জ গেট দেখে আবার ঢাকায় ফেরা। একটি দিনের আপনার এ বিক্রমপুর ভ্রমণ অনেক অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দেবে।
আচার্য বসুর পৈতৃক বাড়ির নৈসর্গিক পরিবেশে প্রায় পাঁচ একক জমির ওপর গড়ে উঠেছে স্যার জেসি বোস কমপ্লেক্স। এখানে আছে বিজ্ঞানীর ছবি সংবলিত সুদৃশ্য গেট, কাঁটাতারের বেষ্টনী, সুদৃশ্য কাঠের ঘর, রান্নাঘর, কাঠের ব্রিজ, ছাতা, দোলনা, বসার বেঞ্চ, দুটি বিশাল পুকুরে শান বাঁধানো বড় বড় ঘাট, প্যাডেলচালিত নৌকা, বিশ্রাম কক্ষ ইত্যাদি। জেসি বোস কমপ্লেক্স পিকনিক স্পট, শিক্ষা সফরের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। এখানে একশ’ জন পর্যন্ত ভাড়া ৫ হাজার টাকা, দুশ’ পর্যন্ত ১০ হাজার টাকা এবং এর বেশি হলে ভাড়া আলোচনা সাপেক্ষ। এলাকার দানশীল ব্যক্তিদের সহায়তা নিয়ে এ কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি, মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষ।

স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর পৈতৃক বাড়ির ছয় কক্ষবিশিষ্ট এক তলা ভবনের একটি কক্ষ সংস্কার করে মিউজিয়ামে রূপান্তর করা হয়েছে। বাকি পাঁচটি কক্ষই অকেজো হয়ে গেছে। ১৯৯৪ সালে মিউজিয়ামটি প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ড. ইঞ্জিনিয়ার এমএ কাসেম। মিউজিয়ামের অনেক মূল্যবান ছবি, ডকুমেন্টস, পাণ্ডুলিপি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রায় আড়াইশ’ বছরের পুরনো এ ভবনটি সংস্কার করা না হলে পৃথিবী বিখ্যাত এই বিজ্ঞানীর বাংলাদেশে একমাত্র স্মৃতিচিহ্নটুকুও ধ্বংস হয়ে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here