মোস্তাফিজুর মোস্তাক
নেত্রকোনার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়. দক্ষিণে কিশোরগঞ্জ জেলা, পূর্বে সুনামগঞ্জ জেলা এবং পশ্চিমে ময়মনসিংহ জেলা দ্বারা পরিবেষ্টিত। ব্রহ্মপুত্র নদীর পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত নেত্রকোনা জেলার রয়েছে ইতিহাস ও প্রাচীন ঐতিহ্য। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় প্রেম-ভালবাসার ধারা বিবরণীর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ সাহিত্যের অাঁধার এ অঞ্চলেই শুরু। মানবীয় অনুভূতিকে প্রাধান্য দান, শাস্ত্র ও ধর্ম নিষ্ঠার পরিবর্তে ব্যক্তি অভিরুচিকে মূল্যায়ন এবং সামপ্রদায়িক নিরপেক্ষ জীবন জীবিকা এ অঞ্চলের মানব প্রাণের অন্যতম বৈশিষ্ট।

ইতিহাস রচয়িতা ভূতাতি্বকগণ এ অঞ্চলের ভূ-তাতি্বক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে ভূ-ভাগ সৃষ্টি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। গারো পাহাড়ের পাদদেশ লেহন করে এঁকেবেঁকে কংশ, সোমেশ্বরী নদীসহ অন্য শাখা নদী নিয়ে বর্তমান নেত্রকোনা জেলার জলধারায় পলিযুক্ত মাটি হাওড় ও খ- খ- জলধারায় উর্বর হয়ে আছে এ জেলা। জেলার উঁচু উত্তরাংশ দক্ষিণে ক্রমশ নিচু হয়ে সমতল ভূ-ভাগে রূপ নিয়েছে। সমগ্র জেলাই উর্বর ভূমি দিয়ে গঠিত। সেই উর্বর ভূমিতে বসে ঢেউয়ের মেলা। সোনালি ক্ষেত ও হাওড়ের জলের ঢেউয়ে নেচে ওঠে এলাকার কৃষকের প্রাণ। তাইতো এ জেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য কৃষি। এখানে ধান শালিক, ডাহুক, কুড়াসহ নানান রং-বেরঙের পাখির বসে মেলা। প্রকৃতি হয় সরব। এ জেলা চীনা মাটি, হাওড় ও সুস্বাদুু বালিশ মিষ্টির জন্য বিখ্যাত। নেত্রকোনা জেলায় অনেক প্রাচীন স্থাপত্য রয়েছে। সে সকল স্থাপত্যগুলো অধিকাংশই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেছে। কিছু স্থাপত্য এখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। নেত্রকোনার ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মদনপুরের হযরত শাহ্ সুলতান কমর উদ্দিন রুমি (র) মাজার, শাহ্ সুখূল আম্বিয়া মাজারের পাশে মোগল যুগের এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ, পুকুরিয়ার ধ্বংসপ্রাপ্ত দুর্গ, নাটেরকোণার ধ্বংসপ্রাপ্ত ইমারতের স্মৃতিচিহ্ন, দুর্গাপুর মাসকান্দা গ্রামের সুলতানি যুগের এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ।

বিলু কবীরের লেখা ‘বাংলাদেশের জেলা : নামকরণের ইতিহাস’ বই থেকে জানা যায়, পাঠান রাজন্য আমল হতে ব্রিটিশ ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি আমল অব্দি এক দীর্ঘ ঐতিহ্যি সমৃদ্ধি রয়েছে এই নেত্রকোনায়।

ব্রিটিশ প্রাশাসনিক আমলেই এই অঞ্চলটি ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত ছিল। চাষ ও বাণিজ্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট ভীতকে সুসংহত করার লক্ষ্যে ব্রিটিশ প্রশাসন ময়মনসিংহ জেলার গারো পাহাড়ি ও হাওড়ি নেত্রকোনা জনপদকে শাসনের আওতায় আনতে চেষ্টা চালিয়ে যায়। পরবর্তীতে এই লক্ষ্যে এখানে মহকুমা স্থাপনের উদো্যগ নেয়া হয়। ‘নাটোরকোণা’ নামক গ্রামে প্রাথমিক জরিপকর্ম সম্পন্ন করেন। নাটোরকোণা গ্রামটি বর্তমানে নেত্রকোনা জেলা শহরের সাত-আট কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। উক্ত প্রাশাসনিক জরিপ শেষে নাটোরকোণা গ্রামে মহকুমা স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রাশাসনিক কাজকর্ম নাটোরকোণা গ্রামেই চলতে থাকে। এই ‘নাটোরকোণা’ নামটিই কালে ‘নেত্রকোনা’ উচ্চারণরূপ ধারণ করে।

আবার অনেকেই মনে করেন, নেত্রকোনার আগের নাম ছিল কালীগঞ্জ। এখানে নেত্রকোনা মহকুমা স্থাপিত হবার পরও বহুবছর মানুষ নেত্রকোনাকে কালীগঞ্জ বলেই অভিহিত করতেন। আরও লোকশ্রুতি রয়েছে, নেত্রকোনা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত মগরা নদীর বাঁকটি চোখের বা নেত্রের কোণের মতো বলে এই এলাকার নামকরণ করা হয়েছে ‘নেত্রকোনা’। আবার কেউ কেউ এমনও মনে করেন যে, মগড়া ও কংশনদী পরিবেষ্টিত এলাকটি দেখতে অনেকটা চোখের মতো বা নেত্রের কোণসর্দশ বলেই এই রকম নামকরণ হয়েছে। তবে ধারণা করা হয় যে, নেত্রকোনা শব্দটি ‘নাটোরকোণা’ থেকেই হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here