আপেল মাহমুদ
‘ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারের অবহেলার কারণে নবাববাড়ির ফটকের একাংশ আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে। সেই জায়গায় গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন। এখন যতটুকু আছে তা সংরক্ষণেও কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। ২০০৮ সালে ফটকের অংশবিশেষ ভেঙে পড়লে কিছুদিন তাদের তোড়জোড় দেখা যায়। এরপর দুই বছরেরও বেশি সময়ে ফটক সংরক্ষণে তারা বাস্তব কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’ ক্ষোভের সঙ্গে কালের কণ্ঠকে কথাগুলো বললেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ্ স্মৃতি কমিটির সভাপতি খাজা মো. কামেল।
নবাববাড়ির ফটক সংস্কার ও সংরক্ষণে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন আরো অনেক স্থানীয় বাসিন্দা। হরিপদ দত্ত নামের একজন বলেন, জরাজীর্ণ ফটকটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে বলে স্থায়ী বাসিন্দারা জানান।
পুরান ঢাকার নবাববাড়ির প্রধান ফটকটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত স্থাপনা। এটি ঢাকার নবাবদের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এখনো টিকে আছে। ১৪০ বছরের পুরনো জরাজীর্ণ ফটকটির বাকি অংশ যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। এতে ফটকের নিচে অবস্থানরত দোকানি কিংবা পথচারীদের প্রাণহানিও ঘটতে পারে।
সরেজমিন দেখা যায়, দুই পাশে থাকা বহুতল ভবন আর বিদ্যুৎ, টেলিফোন ও ইন্টারনেটের তার যেন এর টুঁটি চেপে ধরেছে। এই অবস্থায়ই ফটকের নিচে বসানো হয়েছে নানা কায়দায় বেশকিছু কাপড়ের দোকান। প্রায় দুই বছর আগে ফটকের ওপর দিকে জমে থাকা শত শত মণ আবর্জনার স্তূপ ভেঙে নিচে পড়ে গেলে সর্বত্র হৈচৈ পড়ে। তখন ঘটনাস্থলে এসে প্রত্নতত্ত্ব্ব অধিদপ্তরের কর্মীরা ফটক মাপজোখ করে তাঁদের দায়িত্ব শেষ করেন। এখনো কোনো সংস্কারকাজ হয়নি। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, যেকোনো সময় ফটকটি ভেঙে ঢাকার মানচিত্র থেকে নবাবদের টিকে থাকা শেষ কীর্তি মাটির সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
১৮৭২ সালে আহসান মঞ্জিল উন্নয়নকাজের সময় নবাব আবদুল গনি নবাববাড়ির প্রধান ফটকটি তৈরি করেছিলেন। দোতলা ফটক নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল, উঁচু থেকে নিরাপত্তারক্ষীরা যাতে দূরের শত্রুও দেখতে পায়। এই ফটক থেকেই নবাববাড়ির অতিথিদের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে অন্দরমহলে অভ্যর্থনা জানানো হতো। তবে ১৯৮৫ সালে আহসান মঞ্জিলকে জাদুুঘরে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার সময়ে ফটক সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার। এ সুযোগে স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ী ফটকের চারপাশে দোকানপাট নির্মাণ করে ব্যবসা ফাঁদে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ২০০২ সালে এটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তার পরও তা দখল করে রেখেছেন বস্ত্র ব্যবসায়ীরা। ২০০৪ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ঢাকা জেলা প্রশাসন ও নবাব আবদুল্লাহ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের সহযোগিতায় ফটকটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে তা ভেস্তে যায়। এরই মধ্যে তিন খিলানবিশিষ্ট ফটকের দুটি খিলান ভেঙে সেখানে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। ফটকের পূর্ব পাশে তৈরি ১৪ তলা ভবনের একাংশ দখল করেছে ফটকের প্রায় ১০ ফুট জায়গা। ফটকের পশ্চিম পাশের খিলানের একাংশেও তৈরি হয়েছে বহুতল ভবন। ২০০৮ সালের ২০ জুলাই ভোর ৬টার দিকে ফটকের ওপর দিকের পাটাতন ভেঙে পড়ে। তখন ফটকের নিচে কোনো লোকজন ছিল না বলে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পরিচালক (ঢাকা অঞ্চল) মো. আবদুল খালেক জানান, পুরাকীর্তি সংস্কার একটি স্পর্শকাতর ব্যাপার। কারণ সংস্কারকাজে কোনো ভুল হলে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। তাই নবাববাড়ির ফটক সংস্কারে কোন উপায় বা উপাদান ব্যবহার করা হবে, তা নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। এখন বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্যোগে নিমতলীর দেউড়ি সংরক্ষণ করা হচ্ছে। নিমতলী দেউড়ির সংস্কারকাজটি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এটি যে পন্থায় সংস্কার করা হচ্ছে, তা যদি সফল হয় তবে নবাববাড়ির ফটক সংস্কারে সেই পন্থা অনুসরণ করা হবে বলে তিনি জানান। তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আসলে ওই অধিদপ্তরের এমন কোনো বিশেষজ্ঞ বা অর্থ নেই, যা দিয়ে নবাববাড়ির ফটকটি সংস্কার করা যায়।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নবাববাড়ির প্রধান ফটকটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত হলেও তা কোনো দিন তাদের দখলে ছিল না। ইসলামপুরের ব্যবসায়ীরা ফটকের জায়গা দখল করে সেখানে বেশ কিছু দোকানপাট গড়ে তুলেছেন। এ কথার সত্যতা স্বীকার করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে, অবৈধ দখলদারদের দৌরা@ে@@@্যর কারণে ইতিমধ্যে কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও ফটকটি মেরামত করে সংরক্ষণ করা যায়নি। ২০০৪ সালে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তা যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসন ও নবাব আবদুল্লাহ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের সহযোগিতায় উদ্যোগ নিলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে তা ব্যাহত হয়। তবে ফটকটির আংশিক ভেঙে পড়ার পর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় তা সংস্কারের পরিকল্পনা করা হলেও বাস্তবায়িত হয়নি।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই নবাববাড়ির মূল ফটকটি স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দখল করে নিতে পেরেছেন। ১৯৮৫ সালে আহসান মঞ্জিল সংরক্ষণ করে জাদুঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। তখন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও জাতীয় জাদুঘর থেকে দুটি প্রকল্প দলিল তৈরি করে সরকারের কাছে পেশ করা হয়। কিন্তু সরকার জাতীয় জাদুঘরের প্রকল্পটি গ্রহণ করে। সে মোতাবেক আহসান মঞ্জিল সংস্কার করে জাদুঘরে পরিণত করা হয়। এর মধ্যে আহসান মঞ্জিলে প্রবেশের মূল ফটকটি সংরক্ষণের বাইরে থেকে যায়। এ সুযোগে স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ী ফটকের চারদিক দখল করে দোকানপাট নির্মাণ করেন। এর মধ্যেই ফটকটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝতে পেরে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ২০০২ সালে এটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
খাতাপত্রে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি করা হলেও বাস্তবে ফটকটি ছিল অবৈধ দখলদারদের হেফাজতে। তখন দখলদারদের উচ্ছেদ করে ফটকটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। ফলে অধিদপ্তর থেকে তা সংস্কার কিংবা সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে তিন খিলানবিশিষ্ট ফটকের দুটি খিলান ভেঙে সেখানে অবৈধ দখলদাররা বহুতল ভবন নির্মাণ করে। পূর্ব পাশের ফটকের প্রায় ১০ ফুট জায়গা জোরপূর্বক দখল করে ১৪ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। পশ্চিম পাশের খিলানের জায়গায়ও বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে। এসব কারণে ফটকটি বর্তমানে হুমকির মুখে পড়েছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা ইদ্রিস দেওয়ান।
এদিকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কোর্ট অব ওয়ার্ডস থেকে বলা হয়েছে, ঢাকার নবাবদের সব সম্পত্তি দেখাশোনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করার একমাত্র আইনি অধিকারপ্রাপ্ত তারা। এরপর ফটক কিংবা ফটকের প্রবেশপথ যারা দখল করে রেখেছে, তারা জালিয়াতচক্র। ঢাকার নবাবদের বংশধর দাবি করলেও আসলে তারা ভুয়া নবাব। এমন হাজার হাজার মানুষ সম্পত্তি দখলের জন্য ঢাকার নবাববাড়ির বংশধর সেজে বসে আছে।
ইসলামপুর এলাকার বাসিন্দা হেকমত উল্লাহ ফরাজি জানান, নবাববাড়ির জায়গাজমি দখল করার স্বার্থে কেউ নবাববাড়ির মাতৃকুল, আবার কেউ পিতৃকুল দাবি করে থাকে। তারা ফটকের রাস্তাটি দখল করে শত শত দোকানপাট তৈরি করে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তারা সবাই ভূমি জালিয়াত। তাদের আখড়া তল্লাশি করলে শত শত ভুয়া দলিল পাওয়া যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here