ট্রাভেলঅন২৪ ডটকম ডেস্ক
পর্যটকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য জেলা বান্দরবানে আবাসিক হোটেল ব্যবসা খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। ব্যাংক ঋণ সহজতর হওয়ায় প্রথাগত ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি এ খাতে বিনিয়োগে এখন অনেকেই এগিয়ে আসছেন। নতুন উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, গত দুই বছরে বান্দরবান জেলা সদরে গড়ে ওঠা হোটেলগুলো ভালো ব্যবসা করতে সমর্থ হওয়ায় হোটেল ব্যবসায়ের দিকে তাঁরা আগ্রহী হয়েছেন। জানা গেছে, বান্দরবান বোমাং রাজপরিবারের সদস্য প্রকৌশলী উ চ প্রু কর্মজীবন শেষে তাঁর মালিকানাধীন চারতলা ভবনকে সংস্কার করে প্রতিষ্ঠা করেন সাংগু রেসিডেন্সিয়াল হোটেল। বান্দরবান সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ থানজামা লুসাইও তাঁর বসতবাড়ির প্রবেশমুখের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে স্থাপন করেন বহুতল গ্রিনল্যান্ড হোটেল। অবসরপ্রাপ্ত উপসচিব আবদুল ওয়াহাবও তাঁর বাড়িকে সংস্কার করে সেটিকে আবাসিক হোটেলে রূপ দেন। তিনি এর নাম দেন বান্দরবান গেস্ট হাউস। তাঁরা সবাই নিজস্ব পুঁজির পাশাপাশি সহায়তা নিয়েছেন ব্যাংকঋণেরও।
অগ্রণী ব্যাংক ব্যবস্থাপক জানান, নিজস্ব উদ্যোগ ও প্রাথমিক পুঁজির সঙ্গে ব্যাংকগুলোর ঋণসুবিধা থাকায় স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা পর্যটন সম্ভাবনাময় এ জেলায় হোটেল-রেস্টুরেন্ট খাতের দিকে ঝুঁকছেন। অগণী ব্যাংক বান্দরবান শাখার ব্যবস্থাপক নিবারণ চন্দ তঞ্চঙ্গ্যা কালের কণ্ঠকে জানান, বিনিয়োগ নিরাপত্তার দিক বিবেচনায় বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও হোটেল নির্মাণে ঋণসহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। নিবারণ তঞ্চঙ্গ্যা জানান, ঋণসহায়তা পাওয়ার আবেদন জানিয়ে বেশ কয়েকটি প্রকল্প প্রস্তাব তাদের কাছে এসেছে। ইতোমধ্যে সাংগু রেসিডেন্সিয়াল হোটেল স্থাপনে অগ্রণী ব্যাংক, বান্দরবান শাখা এক কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং গ্রিনল্যান্ড হোটেলের অনুকূলে ৯৮ লাখ টাকা ঋণ প্রদান করেছে। অন্য প্রস্তাবগুলো তাদের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
পর্যটন খাতে বিনিয়োগে সবচেয়ে এগিয়ে এসেছে বেসরকারি ইসলামী ব্যাংক। তারা নির্মাণাধীন হোটেল হিলভিউ কর্তৃপক্ষের অনুকূলে পাঁচ কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুর করেছে। প্রস্তাবিত মতি টাওয়ার এ ব্যাংক থেকে প্রাথমিক ঋণ পাচ্ছে এক কোটি টাকা। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মানিক দাশ প্রায় চার কোটি টাকা নিজস্ব অর্থে হোটেল ফোর স্টার নির্মাণ করলেও তাঁর মালিকানাধীন থ্রি স্টার হোটেল পরিচালন ব্যয় হিসেবে ইসলামী ব্যাংক থেকে ৪০ লাখ টাকার ঋণ নিয়েছেন। ইসলামী ব্যাংক বান্দরবান শাখার ব্যবস্থাপক নুরুল হোসেইন কাওসার জানান, আরো কয়েকটি বড় ভবন, হোটেল ও মার্কেট নির্মাণে ঋণ প্রদানের বিষয়ে তারা প্রকল্প প্রস্তাব বিবেচনা করছেন। বান্দরবান শহরের কেন্দ স্থলে স্থাপিত হোটেল প্লাজা কক্ষ সংখ্যা এবং সার্ভিসের দিক থেকে ইতোমধ্যে জেলার অন্যতম প্রতিষ্ঠানের খ্যাতি অর্জন করেছে। স্থাপনের প্রথম বছরেই হোটেলটি লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে। হোটেলের জেনারেল ম্যানেজার এইচ এ রাহাত ইলাহী কালের কণ্ঠকে জানান, এ হোটেলের নির্মাণ খাতে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। প্লাজার মালিক মাহবুবুর রহমান হোটেল নির্মাণের জন্য চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ সহায়তা নিয়েছেন।
এক যুগ আগে দেশের খ্যাতিমান ট্যুর অপারেটর ‘দি গাইড ট্যুরস’ বান্দরবান জেলা সদর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে একটি রিসোর্ট স্থাপনের উদ্যোগ নিলে স্থানীয় বাসিন্দারা হতবাক হয়ে যান। কিন্তু বান্দরবান-থানচি-রুমা সড়কের পাশে একটি নির্জন পরিবেশে প্রতিষ্ঠানটি চালুর পর এর ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখে এ খাতে বিনিয়োগ করতে বেশ কয়েকজন বেসরকারি উদ্যোক্তা এগিয়ে আসেন। কিন্তু ভূমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা এবং বিশেষ এলাকা হিসেবে নানা বিধিনিষেধের কারণে এসব উদ্যোগে ভাটা পড়ে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এক যুগ আগেও বান্দরবান জেলা সদরে সাধারণ মানের হাতেগোনা কয়েকটি আবাসিক হোটেল ছিল। আশির দশকের শেষ ভাগে স্থানীয় ব্যবসায়ী কাজল কান্তি দাশ কালেক্টরেট ভবন ঘেঁষে নির্মাণ করেন পূরবী হোটেল। এর পর তিনি শহরের প্রবেশমুখে হোটেল হিলবার্ডের মালিকানা ক্রয় করে তা সংস্কার করে মাঝারি মানের হোটেলে রূপ দেন। মাঝখানে প্রায় এক দশক থেমে থাকার পর ২০০৯ সালের দিকে পর্যটকদের বাড়তি চাপের কারণে এখানে পর্যটন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা জেগে ওঠে। ২০০০ সালের দিকে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন শহরের মেঘলা পর্যটন স্পটের পাশে নির্মাণ করে একটি ৫০ বেডবিশিষ্ট মোটেল। ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নানা অসুবিধার কারণে পরে এটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
২০০৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বান্দরবানসহ পার্বত্য জেলাগুলোতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য এ অঞ্চলে ঋণ শর্ত শিথিল করার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিলে খুলে যায় পর্যটন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় দ্বার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here