মাহমুদ হোসেন পিন্টু
২৯ মে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে মহাস্থানগড়ের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখেছে বিশেষ কমিটি। মহাস্থানগড়ের প্রত্নসম্পদ রক্ষায় হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত বিশেষ কমিটির অন্যতম সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন বলেন, হাইকোর্ট ৬০ দিন সময় দিয়েছেন প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য। সাইটগুলো ঘুরে দেখা হয়েছে। এখন কমিটির সব সদস্য বসে করণীয়গুলো ঠিক করে প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। জুলাই মাসের মধ্যে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল হয়ে যাবে।
মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘মহাস্থানগড়ের ঐতিহ্য রক্ষায় সব প্রতিবন্ধকতা, ভুল বোঝাবুঝি ও স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র আমাদের রুখতে হবে। হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী স্থানটি যাতে ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ হিসাবে স্থান পেতে পারে, সেজন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ চেষ্টা চালাতে হবে।’
২৯ মে ৭টায় কমিটি মহাস্থানগড়ের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা দেখার জন্য সরেজমিন মাজার কমপেৱক্স এলাকায় যায়। সেখানে মাজার উন্নয়ন কমিটির পক্ষ থেকে বহুতল ভবন করার জন্য খনন করা স্থান, হযরত শাহ সুলতান বলখির (রঃ) মাজার শরীফ, নামাজ আদায় করার জন্য নির্ধারিত নতুন ও পুরনো মসজিদ, হান্ডিখানা, খানকাহ শরীফ পরিদর্শন করেন কমিটির সদস্যরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ঐতিহ্য রক্ষা কমিটির সমন্বয়ক প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. শফিকুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শিল্পী হাশেম খান, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শ্যামসুন্দর শিকদার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান, ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের প্রতিনিধি শাহ আলম, বগুড়া সরকারি আযিযুল হক কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রধান সুলতানা সেলিনা, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের রাজশাহী বিভাগীয় প্রধান বদর্বল আনাম ও মাজার উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মমতাজ উদ্দিন। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন জানান, মহাস্থানগড়ের বিশাল এলাকার জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন। তাদের সরিয়ে দেওয়ার  মতো কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। তবে জনগণকে বুঝতে হবে যেহেতু প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা এটি, সেহেতু তাদের ব্যক্তিগত জমি হলেও সেটা দেখভালের দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের। মাটির নিচের কোনো নিদর্শন তারা ধ্বংস করতে পারে না। এখানে যে কোনো ধরনের কাজ করতে হলে আগে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তাদের জানাতে হবে। পরিদর্শনকালে মুনতাসীর মামুন মহাস্থানগড় মাজারের মূল জমি কত, তার সার্ভে করাসহ এ ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা পেতে সেই সময়ের পুরনো মসজিদের ছবি, পাশে যেসব অব্যবহৃত জায়গা আছে সেগুলোতে যে কোনো স্থাপনা নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করার জন্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে অনুরোধ জানান। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শ্যামসুন্দর শিকদার জানান, ১৯০৪ সালে একটি গেজেট অনুযায়ী মহাস্থানগড়ের মূল মাজার এলাকা থেকে চারপাশে চারমাইল এলাকার প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন। এদিকে এই কমিটি মহাস্থানগড় এলাকার স্থানীয়দের বাড়িঘর ভেঙে দিতে আসছে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী মহাস্থান জাদুঘর এলাকায় সমবেত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন ও সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে। স্থানীয়  জনপ্রতিনিধিরা প্রকৃত তথ্য জানালে পরিস্থিতি শান্ত হয়। তারা দাবি করেন, বংশ পরম্পরায় তারা যেসব স্থানে বসবাস করছেন তাদের সেখানে আগের মতো থাকতে দিতে হবে। এর আগে শনিবার বিকেলে এই কমিটির সদস্যরা বগুড়া সার্কিট হাউসে সুধীসমাজ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে পৃথক মতবিনিময় করেন। সেখানে মহাস্থানগড়ের প্রত্নসম্পদ রক্ষায় সবার সহযোগিতা চাওয়া হয়।

মহাস্থান রক্ষায় নিজের সম্পদ
নিজে রক্ষা করার উদ্যোগ
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুরাকীর্তি আবিষ্কারের পর লুণ্ঠিত হয়ে প্রায়ই বিদেশে পাচার হয়ে যায়। এই লুণ্ঠন বন্ধের জন্য বগুড়া জেলার মহাস্থানগড় এলাকায় ২১ মে  সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে নাগরিক উদ্যোগ নেয়া হয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দেশে এই প্রথম ‘নিজের সম্পদ নিজে রক্ষা কর’ নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মহাস্থানগড় এলাকায় ১০টি কলেজ-স্কুল থেকে ১৫০ ছাত্রকে স্বেচ্ছাসেবী সংস্কৃতি সম্পদ সংরক্ষণ প্রহরী তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক সত্যাগ্রহের মূলনীতি ‘নিজের সম্পদ রক্ষা কর’ এই শপথ গ্রহণ করে ছাত্ররা তাদের নিজ নিজ এলাকায় পুরাকীর্তি  সংরক্ষণ করবে। সম্পদ রক্ষায় ছাত্ররাই পাহারা দেবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি দেশের পুরাকীর্তি সেই দেশের অতীতকালের সাক্ষ্য বহন করে। দেশটি কত উন্নত ছিল, তার কৃষ্টি-সংস্কৃতি কত উৎকর্ষ লাভ করেছিল। এমন একটি পুরাকীর্তি পরিচয় বহন করে বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়। বগুড়া জেলার ইতিহাস প্রসিদ্ধ করতোয়া নদীর তীরে এবং ঢাকা-দিনাজপুর বিশ্ব রোডের পাশে এই ঐতিহ্যবাহী মহাস্থানগড় অবস্থিত। প্রাচীন যুগের বহু ধ্বংসাবশেষ এখানে বিদ্যমান। বিভিন্ন সময়ে সরকার থেকে খনন করে পাথর, মূর্তি শিলা, ঘরবাড়ি এবং বিভিন্ন সময় মুদ্রা পাওয়া গেছে। মহাস্থানগড় যে পুরাকীর্তির একটি অন্যতম নিদর্শন স্থান তা স্পষ্ট বোঝা যায়। অতি প্রাচীনকালে ‘পুন্ড্র রাজা’ ছিল। এই পুন্ড্র রাজ্যের সীমানার মধ্যে ছিল বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা, রাজশাহী, বালুরঘাট, মালদহ, কুচবিহার প্রভৃতি স্থান। এই রাজ্যে এক এক সময় এক এক রকমের নামকরণ করা হয়েছে। মহাস্থানগড়ের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রয়েছে বহু সংখ্যক প্রাচীন নিদর্শন। প্রায় তিন হাজার বছর আগে থেকে শুরু করে মুসলিম যুগের শেষ পর্যন্ত বহু নিদর্শন প্রত্নতাত্ত্বিকরা খননকার্যের  মাধ্যমে আবিষ্কার করেন। মহাস্থানগড়ের মধ্যে অনেকে নিজস্ব অবকাঠামো গড়ে তুলছেন। প্রাচীন যুগের ইট খুলে নেয়া হচ্ছে। এখানকার পাথর, মূর্তি, শিলা, বিভিন্ন আমলের মুদ্রা চুরি হয়ে গেছে। বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে গড়ের ওপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহাস্থানগড়ের অবকাঠামোর উন্নতির জন্য একটি সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here